উলামায়ে কিরাম হলেন নবী-রাসুলগণের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী। তাঁদের এই উত্তরাধিকার কোনো পার্থিব সম্পত্তির নয়; বরং তা হলো মানবজাতির জন্য কল্যাণময় ও ফলপ্রসূ জ্ঞানের উত্তরাধিকার।
কিন্তু এই আলেমসমাজ সবাই এক স্তরের নন; তাঁদের পথ ও পরিচয় সম্পূর্ণ ভিন্ন।
একদল হলেন ‘রব্বানি আলেম’—যাঁরা পথভ্রষ্ট মানুষকে সত্য ও হেদায়েতের পথে ডাকেন। মানুষের অজ্ঞতাপ্রসূত আঘাত ও লাঞ্ছনা হাসিমুখে সহ্য করেন। কুরআনের সঞ্জীবনী পরশ দিয়ে তাঁরা আত্মিক মৃতদের পুনরুজ্জীবিত করেন। মানুষের জন্য তাঁরাই তো প্রকৃত কাণ্ডারি। তাঁরাই শ্রেষ্ঠ ইমাম ও দিশারি।
বিপরীতে আলেমদের ভেতরেই রয়েছে আরেকটি দল—যাঁরা ‘উলামাউস সূ’ বা অসৎ আলেম। দুনিয়ার মেকি মোহ, মানুষের সস্তা প্রশংসা ও পদমর্যাদার লোভ তাঁদের অন্ধ করে ফেলেছে। তাঁরা পার্থিব জীবনের তুচ্ছ বিলাসেই বিভোর হয়ে গেছেন এবং সামান্য দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাতকে বিক্রি করে দিয়েছেন।
ফলে যে আলেমদের থাকার কথা ছিল জাতির নেতৃত্বে, তাঁরা আজ মানুষের চোখে ঘৃণ্য ও লাঞ্ছিত; একদা যাঁরা ছিলেন সমাজের সম্মানিত কাণ্ডারি, আজ তাঁরা আত্মসম্মান হারিয়ে চরম হীনতার অতলে নিমজ্জিত।
ইমাম হাসান বসরি (রহ.)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “একজন আলেম যখন দুনিয়ার মোহে পড়ে, তখন তার শাস্তি কী হয়?”
তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: “তার শাস্তি হলো—অন্তরের অপমৃত্যু! আলেম যখন দুনিয়াসক্ত হয়ে পড়ে, তখন সে আখেরাতের আমল ও ধর্মীয় জ্ঞানকে দুনিয়া উপার্জনের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলে। ঠিক তখনই তার জ্ঞান থেকে সমস্ত বরকত ও রুহানিয়াত উবে যায়, আর পড়ে থাকে কেবল নিছক বাহ্যিক খোলসটুকু!” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ২৬৮)
একজন আলেম যখন পার্থিব মোহে পড়েন, তখন তিনি দুনিয়াদারদের পদলেহনে লিপ্ত হন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের মনোরঞ্জনে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেন।
এ প্রসঙ্গে সালাফের একটা প্রবাদ হলো: “নিকৃষ্টতম শাসক সে-ই, যে আলেমদের থেকে দূরে থাকে; আর নিকৃষ্টতম আলেম সে-ই, যে শাসকদের রাজদরবারে পড়ে থাকে!” (জামিউ বায়ানিল ইলম, ইবনে আবদিল বার, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৪১)
● সমাজ বিনির্মাণে হক্কানি আলেমদের অবস্থান
পক্ষান্তরে আমলদার ও সত্যনিষ্ঠ আলেমরা পৃথিবীর বুকে আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো—ঘোর অন্ধকারে পথহারা পথিকেরা যাঁদের আলো দেখে সঠিক পথের দিশা পায়। মানবসমাজের কাছে তাঁদের প্রয়োজনীয়তা অন্ন-বস্ত্রের চেয়েও অনেক বেশি।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যকার উলিল আমরের (নেতৃত্ব ও কর্তব্যের অধিকারীদের) আনুগত্য করো। অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও—যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখো। এটিই শ্রেয় এবং পরিণামে সর্বোত্তম।” [সুরা নিসা: ৫৯]
প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-সহ বহু মুফাসসির বলেছেন: আয়াতে ‘উলিল আমর’ বলতে মূলত ‘উলামা’ বা শরিয়তের গভীর প্রজ্ঞাসম্পন্ন আলেমদের বোঝানো হয়েছে; আবার অন্য বর্ণনামতে এর অর্থ ন্যায়পরায়ণ শাসকশ্রেণি।
এই দুই ব্যাখ্যার মাঝে সুগভীর সমন্বয় ও চূড়ান্ত ফয়সালা দিয়ে ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) লিখেছেন:
“বাস্তব সত্য হলো—শাসকদের আনুগত্য কেবল তখনই ওয়াজিব, যখন তাদের আদেশ ইলম বা শরিয়তের বিধানের অনুগামী হয়। সুতরাং শাসকদের আনুগত্য মূলত আলেমদের আনুগত্যেরই অধীন! কারণ ইসলামে আনুগত্য তো কেবল ন্যায়সঙ্গত ও শরিয়তসম্মত বিষয়েই হতে পারে।
আর তাই, আলেমদের আনুগত্য যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্যের অনুবর্তী, তেমনি শাসকদের আনুগত্যও আলেমদের ফতোয়া ও সিদ্ধান্তের অধীন।
একটি মুসলিম সমাজের সৌধ মূলত দুটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত—একদল আলেম, অন্যদল শাসক; আর সমগ্র মানবজাতি এই দুটি দলেরই অনুগামী। অতএব, এই দুই শ্রেণির শুদ্ধতার ওপরই পুরো সমাজের কল্যাণ নির্ভর করে, আবার এদের ভ্রষ্টতার কারণেই গোটা জাতি ধ্বংসের অতলে তলিয়ে যায়।
যেমনটি আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.)-সহ সালাফগণ স্পষ্ট ভাষায় বলে গেছেন: মানুষের ভেতর দুটি শ্রেণি এমন রয়েছে—তারা সৎ হলে গোটা সমাজ সংশোধিত হয়, আর তারা নষ্ট হলে পুরো জাতি ধ্বংস হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করা হলো: তারা কারা? তিনি উত্তর দিলেন: শাসকসমাজ এবং উলামাকুল।” (ইলামুল মুওয়াক্কিয়ীন, ইবনুল কায়্যিম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৮)
ঠিক এই কারণেই সুদূর অতীতে সত্যনিষ্ঠ আলেমরা ছিলেন জাতির অবিসংবাদিত নেতা। তাঁদের ঘিরে স্পন্দিত হতো জনতার হৃদয়, তাঁদের একটিমাত্র ডাকে লাখো মানুষ কাতারবদ্ধ হতো। যেকোনো জাতীয় সংকট ও রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ে মানুষ তাঁদের দরবারেই ছুটে আসত দিকনির্দেশনার জন্য; এমনকি স্বেচ্ছাচারী শাসকেরাও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই নিঃস্বার্থ আলেমদের প্রজ্ঞার কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হতো।
তাই, সমাজের প্রকৃত সংস্কার ও আত্মিক পুনর্জাগরণের জন্য দরকার সেই রব্বানি আলেমদের পুনরুত্থান—যাঁদের প্রজ্ঞা ও নির্ভীক হেদায়েতের আলোয় আবারও আলোকিত হবে গোটা উম্মাহ।